তারা ফ্যানে ঝুলিয়ে পায়ে পেটাত: জজ মিয়া

প্রায় দেড় দশক আগে ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে যে গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, সেই ঘটনায় ‘বলির পাঁঠা’ করা হয় নোয়াখালীর সেনবাগের কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট গ্রামের মো. জালাল ওরফে জজ মিয়াকে।

এই মামলার এক সময়ের আসামি গাড়িচালক জজ মিয়া এখন সাক্ষী। তার সঙ্গে কথা বলতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে রাজধানীর শনির আখড়ায় তার কর্মস্থলে যেতে বলেন তিনি।

মামলাটির রায়ের কয়েকদিন আগে শুক্রবার দুপুরে সেখানকার একটি হাসপাতালের আউটডোরে বসে কথা হলো তার সঙ্গে; শুরুতেই হামলার ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত এবং তাকে যারা ঘটনার সঙ্গে ফাঁসিয়ে দিয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন জজ মিয়া।

“যারা আমাকে এই ঘটনায় জড়িয়েছে এবং গ্রেনেড হামলা চালিয়ে যারা মানুষ হত্যা করেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”

কিভাবে নির্যাতন চালিয়ে তার কাছ থেকে হামলার স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল, তার বর্ণনাও দেন তিনি।

২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত ও কয়েকশ আহত হন।

তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। গ্রেনেড হামলার জন্য তখন ওই সরকারের কর্তাব্যক্তিরা তখন আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেছিলেন; তদন্ত নিয়েও ওঠে নানা প্রশ্ন।

হামলার পরের বছর ৯ জুন বিরকোট গ্রাম থেকে জজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় এনে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তারা দাবি করেন, তিনিই এই হামলার হোতা।

জজ মিয়া তখন ঢাকার গুলিস্তানে ফুটপাতে সিডি-পোস্টারের ব্যবসা করলেও ঘটনার দিন তিনি নোয়াখালীতে তার বাড়িতেই ছিলেন।

জজ মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গ্রেনেড হামলার খবর তিনি গ্রামের একটি চায়ের দোকানে বসে টিভিতে দেখেন; ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিলেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

“আমরা বাজারে গিয়ে মিছিল করেছি, ঘটনার প্রতিবাদ করেছি।”

ওই ঘটনার দিন দশেক পর জজ মিয়া ঢাকায় এলেও কয়েক দিন পরে মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে আবার গ্রামে ফিরে যান। এর কয়েক মাস পরে পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে ঢাকায় সিআইডি অফিসে নেওয়া হয়।

তাকেই কেন লক্ষ্যবস্তু করা হল- তা নিশ্চিত জানতে না পারলেও জজ মিয়া মনে করেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যখন গ্রেনেড হামলার ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে, তখন একজন লোককে খুঁজে বের করার জন্য বিএনপির নীতিনির্ধারকরা দায়িত্ব নেন।

আর তারই এলাকার বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক নেতা তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেন বলে জজ মিয়ার ধারণা।

তিনি বলেন, সেনবাগ থানার পুলিশ মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের কথা বলেছিল। ঢাকা থেকে সিআইডি কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ গিয়ে তাকে ঢাকায় আনার পর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানতে পারেন।

“আমি পরে জেনেছি, ঢাকা থেকে যে সব পুলিশ অফিসার গিয়েছিল তারা বিএনপির এক নেতার বাগানবাড়িতে ছিল।”

জজ মিয়া বলেন, সিআইডি অফিসে তাকে ১০ দিন রাখা হয়। এই সময় বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমান নিয়মিত এসে তার সঙ্গে দেখা করে ক্রসফায়ারের ভয় দেখাতেন ও ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা তিনিই করেছেন- এমন কথা বলতেন।

পরে তাকে আদালতে পাঠিয়ে প্রথম দফা ১০ দিনসহ বেশ কয়েক দফায় প্রায় একমাস তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয় বলে জানান জজ মিয়া।

তিনি বলেন, “আমাকে প্রথমে বলা হয়েছে, এই হামলা আমিই করেছি। কারা কারা জড়িত তাদের নাম জানতে চাইতো। আমি বরাবরই অস্বীকার করতাম। এক সময় তারা আমাকে ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা স্বীকার করার জন্য নির্যাতন করা শুরু করল।

“এমনও দিন গেছে তারা আমাকে দীর্ঘক্ষণ ফ্যানের সিলিংয়ের সাথে ঝুলিয়ে রাখত আর পায়ের তালুতে পেটাত।”

সেই মারের চিহ্ন এখনও রয়েছে জজ মিয়ার শরীরে।

তিনি বলেন, “সিআইডির কর্মকর্তারা বলতেন, এই ঘটনার সুরাহা করতে উপর থেকে যথেষ্ট চাপ আছে, সে স্বীকার না করলে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হবে’। আমাকে মেরে ফেললে মা-বোনের ক্ষতি হয়ে যাবে ভেবেই তাদের (পুলিশ কর্মকর্তাদের) কথায় রাজি হয়ে যাই।

“মিথ্যা বলে যদি বাঁচা যায় সেটাই ভালো মনে করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে হয়েছে আমাকে। তারা বলত, পুলিশের কথায় রাজি হলে সারা-জীবন টাকা-পয়সা নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।”

পরে তাকে হামলার ঘটনা নিয়ে লিখিত বক্তব্য মুখস্থ করানো হতো এবং ঘটনাস্থল ও গুলিস্তান এলাকার ভিডিও বারবার দেখানো হত বলে জানান জজ মিয়া।

‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ রেকর্ড করার সময় সিআইডি কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ ছিলেন জানিয়ে জজ মিয়া বলেন, “এসময় আব্দুর রশিদের এবং ম্যাজিস্ট্রেটের ফোনে বারবার কল আসছিল। কোন ভুল হলে আব্দুর রশিদ তা মনে করিয়ে দিতেন।”

জবানবন্দিতে সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ ও মুকুলসহ বেশ কয়েকজনের নাম বলেছিলেন জজ মিয়া।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তাদের কোনো দিন দেখিনি। শুধু সিআইডির হেফাজতে থাকাকালে কয়েকজন সন্ত্রাসীর ছবি তাকে দেখিয়ে নাম মনে রাখতে বলা হয়েছিল।”

সিআইডি পুলিশের শিখিয়ে দেওয়া জবানবন্দিতে জজ মিয়া এসব সন্ত্রাসীদের নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে ওই সব ‘বড়ভাইদের নির্দেশে’ তিনি গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিলেন।

“এদের মধ্যে একজন হঠাৎ করে আমাকে জেলখানায় দেখে ডাক দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তার নাম কেন বলেছি তা জানতে চায়।”

সিআইডির মাধ্যমে তার পরিবারকেও ‘মাসিক খরচের টাকা’ দেওয়া হত বলেও জানান জজ মিয়া।

কারাগারে থাকার সময় সেনবাগ থানার কবির নামে এক পুলিশের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে মায়ের সাথে সিআইডির কর্মকর্তা রুহুল আমিনের কথা হত বলে জানান তিনি।

জজ মিয়া বলেন, সিআইডির ওই তিন কর্মকর্তা তাদের কথা অনুযায়ী জবানবন্দি দেওয়ার প্রতিদানস্বরূপ তার মাকে ঢাকায় ডেকে এনে প্রতিমাসে নিয়মিত টাকা দিতো।

আদালতে ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ আদায়ের পর জজ মিয়াকে আসামি করেই ২০০৮ সালে চাঞ্চল্যকর মামলাটির অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি।

কিন্তু মামলাকে ‘ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য’ চারদলীয় জোট সরকারের নির্দেশে সিআইডি জজ মিয়াকে নিয়ে নাটক সাজানোর চেষ্টা করে বলে গণমাধ্যমে উঠে আসে, বেরিয়ে আসে পরের তদন্তেও।

জজ মিয়া বলেন, “যতদিন জেলখানায় ছিলাম তার অধিকাংশ সময় তার মাকে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে দিত। ২০০৬ সালে এই ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়।”

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে যে সিআইডির যে তিন কর্মকর্তা এই মামলার তদন্ত করেছিলেন, সেই  রুহুল আমিন, আব্দুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমান এখন এই মামলার আসামি। আর তাদের আসামি জজ মিয়া সাক্ষী।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরও আসামি এই মামলায়; আসামির তালিকায় রয়েছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানও।

জঙ্গিদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিনাশের পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই হামলা চালানো হয়েছিল বলে পরে তদন্তে উঠে আসে।

তদন্তে ‘আসল রহস্য’ উদ্ঘাটনের পর কারামুক্ত হন জজ মিয়া। চাকরি নেন একটি বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশনে গাড়িচালক হিসাবে। ২০১৩ সালে ওই টেলিভিশনের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটলে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন।

জজ মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন কিডনি রোগে ভোগে কিছুদিন আগে তার মা মারা গেছেন। গ্রামের বাসাবাড়ি বিক্রি করেও শেষ সময় টাকার অভাবে তিনি মায়ের সেবা দিতে পারেননি।

দুর্দশার মধ্যে কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না বলে জানান জজ মিয়া। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার যদি একটা চাকরির ব্যবস্থা করত, তা হলে একটা গতি হত। এখন অন্যের গাড়ি চালিয়ে চাহিদা অনুযায়ী টাকা আয় করতে পারি না।

আবার পরক্ষণেই বলেন, “বর্তমান সরকার আমাকে কেনই বা দিবে, বিএনপি সরকারকে আমি সহযোগিতা করেছি না? টাকাও তো নিছি।”

আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বলেন, “আমার মা বিচার দেখে যেতে পারল না। বয়স হওয়ার পরেও আমার কারণে বোনটার বিয়ের সম্বন্ধ আসছে না। অনেক কষ্টে আছি।”

স্ত্রীর খবর জানতে চাইলে মুখের কোণে হাসির ঝিলিক ওঠে জজ মিয়ার। বলেন, “দোয়া করিয়েন ভাই, কিছুদিন পরে বাবা হব।”