গ্রেনেড হামলার পুরো ঘটনা ধামাচাপার চেষ্টা হয়েছিল: কাহার আকন্দ

 

 

 

সিআইডির এই কর্মকর্তার তদন্তেই শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার এই মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, খালেদার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপির তৎকালীন এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সম্পৃক্ততা উঠে আসে।

ঘটনার চার বছর পর তদন্তে হাত দিয়ে কাহার আকন্দ এই হামলার পেছনের ঘটনা তুলে আনেন, দেন সম্পূরক অভিযোগপত্র।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দুই দশক পর তদন্ত করে আসামিদের চিহ্নিত করা কাহার আকন্দ পরে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্তও করেছিলেন।

২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলার আলোচিত মামলাটির রায়ের দুদিন আগে সোমবার তদন্তের নানা দিক নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা হয় কাহার আকন্দের।

জজ মিয়া নামে এক ভবঘুরেকে আসামি করার ‘নাটক’ অবতারণার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “ঘটনাটিকে পুরোপুরি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।  এটা একটা বড় বাধা ছিল (তদন্তে)।”

এর সঙ্গে যে সব পুলিশ সদস্য জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং সরকারি কাজে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। আইনানুযায়ী সেসব সহকর্মীর সাজা পাওয়া উচিৎ বলে মনে করেন কাহার আকন্দ।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে যে তিনজন সিআইডি কর্মকর্তা এই মামলার তদন্ত করেছিলেন, সেই মুন্সী আতিকুর রহমান, রুহুল আমিন ও আব্দুর রশীদ এখন মামলার আসামি। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর ছাড়াও ওই আমলের তিন পুলিশ প্রধান মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরীরও এই মামলায় বিচারের মুখোমুখি।

২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সমাবেশে গ্রেনেড হামলার লক্ষ্য যে শেখ হাসিনাই ছিলেন, তা তদন্তে উঠে এলেও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের তদন্তকারীরা জজ মিয়াকে হামলাকারী বানানোর চেষ্টা করেছিল।

বিএনপি-জামায়াত শাসন অবসানের পর ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে সিআইডির কর্মকর্তা ফজলুল কবীর জঙ্গিনেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করে প্রথম অভিযোগপত্র দেন।

তাতে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে খুন করতে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা এই হামলা চালিয়েছিল।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ অধিকতর তদন্ত চাইলে আদালত তাতে সায় দেয়, তদন্তের দায়িত্বে আসেন কাহার আখন্দ। তার হাত দিয়ে উদ্ঘাটিত হয় জঙ্গিদের দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিনাশের চক্রান্ত। তার দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে আসামির ৩০ জন বেড়ে হয় ৫২ জন।

কাহার আকন্দে সম্পূরক অভিযোগপত্রে হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে মুফতি হান্নানের বৈঠকের কথা উল্লেখ করা হয়।

খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল তার দলীয় কার্যালয় হাওয়া ভবন, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল ছেলে তারেক রহমানের হাতে।

কাহার আকন্দ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০০৪ সালের প্রথম দিকে মুরাদনগরের তৎকালীন এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সহযোগিতায় হাওয়া ভবনে তারা বৈঠক করে। সেখানে তারেক জিয়ার সম্মতি পাওয়ার পর তারা রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বৈঠক করে।”

আদালতে দেওয়া মুফতি হান্নানের দ্বিতীয় দফা জবানবন্দিতে তারেকের সঙ্গে তার বৈঠকের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

কাহার আকন্দ বলেন, ২১ অগাস্টের অভিযান চালাতে সর্বশেষ বৈঠক হয় বাড্ডায়। হামলার আগের দিন ২০ অগাস্ট তৎকালীন উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির বাসা থেকে ১৫টি গ্রেনেড সংগ্রহ করে বাড্ডায় মুফতি হান্নানের অফিসে নেওয়া হয়। সেখানেই চূড়ান্ত এবং শেষ বৈঠক হওয়ার পরদিন হামলা হয়।

সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির বাসায় ১৮ অগাস্ট  যে বৈঠক হয়েছিল, সেখানে মুফতি হান্নান ছাড়াও বাবর, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ ও তৎকালীন ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম ছিলেন বলে জানান কাহার আকন্দ।

মুফতি হান্নানরা আগে থেকেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন।

কাহার আকন্দ বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ফতোয়া অবৈধ বলে হাই কোর্ট রায় দেওয়ার পর জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে প্রতিপক্ষ মনে করা শুরু করে। এর মধ্যে আফগানিস্তানে তালেবানের হয়ে যুদ্ধ করে আসা মুফতি হান্নানরাও ছিলেন।

২০০০ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোটালীপাড়ায় তার এক সভামঞ্চের কাছে বোমা পুঁতে রাখে তারা, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছিল।

এরপর ২০০১ সালে সিলেটে নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও বোমা হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা তারা করেছিল বলে জানান কাহার আখন্দ।

তিনি বলেন, “এই দুটি ঘটনায় মুফতি হান্নানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে সেসময় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরবর্তী সরকার সহযোগিতা করায় ২০০৪ সালের ২১ অগাস্টের ঘটনার জন্ম হয়।”

মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর সরাসরি কোনো বাধা না পেলেও অনেক আলামত নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল জানিয়ে তা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল বলে জানান কাহার আকন্দ।

তিনি বলেন, জজ মিয়াকে দিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া ছাড়াও ঘটনার পর যে সব অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধার করা হয় তা নিস্ক্রিয় করে আলামত হিসাবে থাকার কথা। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংরক্ষণ না করে ধ্বংস করে দেয়, যার উদ্দেশ্য সৎ ছিল না।

দুই বছরে অধিকতর তদন্ত শেষ করা এই সিআইডি কর্মকর্তা দাবি করেন, তারপরও পরিস্থিতির পুরোটাই তিনি আদালতকে বোঝাতে পেরেছেন।

তিনি জানান, তদন্তকালে তিনি ১৭জনকে গ্রেপ্তার করেন। এই ১৭ জনের মধ্যে কয়েকজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

যার তদন্তে তারেকের নাম আসামির তালিকায় এসেছে, সেই কাহার আকন্দকে নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন বিএনপি নেতারা।

তাদের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই মামলায় তাদের দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যানকে জড়ানো হয়েছে এবং এই কাজটি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের ‘অনুগত’ সিআইডি কর্মকর্তা কাহার আকন্দকে দিয়ে।

বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার তদন্ত করার পর বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে কাহার আকন্দকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে চাকরি ফেরত পান তিনি।

অবসরে গেলেও আওয়ামী লীগ সরকার দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে কাহার আকন্দকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সিআইডিকে রেখেছে। পদোন্নতি দিয়ে তাকে করা হয়েছে অতিরিক্ত উপ মহা পুলিশ পরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি)।