অনুমোদন পেল শত বছরের ‘ডেল্টা প্ল্যান’

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া শত বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেল্টা প্ল্যান অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ-এনইসি।

 

 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে মোকাবিলা করে দেশকে কিভাবে উন্নয়নের সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত এ পরিকল্পনা। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশে উন্নীত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এ অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সামনে পরিকল্পনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন, পরিকল্পনা কমিশন ও সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। পরে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

ডেলটা প্লানের বিস্তারিত তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক পরিকল্পনা। পৃথিবীর কোথাও এত দীর্ঘ পরিকল্পনা হয়নি। বাংলাদেশে এটিই প্রথম। পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ পানি সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করা হবে। এর মাধ্যমেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে।

দেশের সবচেয়ে বড় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন পরিকল্পনা কমিশন ও সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম।

তিনি বলেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় দেশে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও মাথাপিছু আয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি রয়েছে নিয়ন্ত্রণে। সেইসঙ্গে সামাজিক খাতেও অগ্রগতি রয়েছে ব্যাপক। এসব বিবেচনায় আমরা ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছি। তাই বলা যায়, ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন অপরিহার্য। কেননা প্রকল্পটির মূল প্রতিপাদ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো।

তিনি আরও জানান, এরই মধ্যে ভূমিতে ক্ষয় হচ্ছে ব্যাপক। নদী ভাঙনের ফলে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। বন্যায় অনেক ফসলহানি হচ্ছে। এর বাইরেও বিশেষ করে শহর অঞ্চলে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কঠিন বর্জ্য ও আবর্জনা ব্যবস্থপনা, কৃষি জমিতে ব্যাপক রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি উৎপাদক শক্তি না কমিয়ে কিভাবে এসব বিষয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে— বাংলাদেশের ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় এসব বিষয়ের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

পরিকল্পনায় হটস্পটে যেসব ঝুঁকি রয়েছে সেগুলো মোকাবেলা করা হবে। তখন আর ঝুঁকি থাকবে না জানিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কন্যা ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, সুযোগ পেলে নেদারল্যান্ড ঘুরে এসো। পরবর্তীতে তিনি অনেক বার নেদারল্যান্ড ঘুরেছেন। তারই নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় এই দীর্ঘ পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনায় নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং এবং পরবর্তীতে মেইটেন্যান্স ড্রেজিং করা হবে। ফলে নতুন ভূমি পাওয়া যাবে। নদী পথের ব্যবহার বাড়ানো হবে। সেই সঙ্গে নদী ভাঙ্গনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা হবে।

ব্রিফিং এ জানানো হয়, ২০১৮-২০৩০ সাল পর্যন্ত মোট ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এই টাকা আসবে সরকারি, বেসরকারি, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এবং জলবায়ু তহবিলসহ বিভিন্ন ভাবে। এজন্য গঠন করা হবে একটি ডেল্টা তহবিল। তাছাড়া ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ডেল্টা নলেজ ব্যাংক।

জানা গেছে, দেশের পানি সম্পদ নিয়ে একশ বছর মেয়াদী পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতে সহায়তা দিয়েছে নেদারল্যান্ড। পরিকল্পনা তৈরির জন্য ৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে দেশটি। ২০১৪ সালে প্রকল্পটি সাজানোর কাজ শুরু হয়। প্রায় সাড়ে তিন বছরে পরিকল্পনাটির অনুমোদন পেল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা। নেদারল্যান্ডের বাইরে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হয়েছে।

পরিকল্পনায় পানি সম্পদ, ভূমি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভূ-প্রতিবেশ খাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ব-দ্বীপ ভূমিতে প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রশাসন সম্পর্কে একটি দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি করার প্রচষ্টা রয়েছে পরিকল্পনায়। সমন্বিত নীতি উন্নয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের সম্ভাব্য বাঁধা চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপর করনীয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে রোডম্যাপ তৈরি এবং সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

ডেল্টা তহবিল গঠনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ বাস্তবায়নের জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ প্রয়োজন হবে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এজন্য জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ সমপরিমান অর্থায়ন সম্বলিত বাংলাদেশ ডেল্টা তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যার মধ্যে ২ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে। জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ সরকারি তহবিল হতে এবং শতকরা ২০ ভাগ বেসরকারি খাত থেকে আসবে।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ এবং পানিসম্পদ স্থাপনা সংক্রান্ত পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সহ কর্মসূচি বা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সরকারি বিনিয়োগের খাতভিত্তিক বিভাজন দিয়ে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে ২০১৯-২১ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগ ধরা হয়েছে (২০১৫-১৬ অর্থবছরের স্থিরমূল্যে) ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ২০২২-৩১ সাল পর্যন্ত ৩২ হাজার ২০০ কোটি টাকা; যা মোট বিনিয়োগের ৫ ভাগ। সহায়ক পরিবেশ খাতে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২ হাজার কোটি টাকা ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ধরা হয়েছে, যা বিনিয়োগের দুই ভাগ। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনসহ প্রধান নদী ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা খাতে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগ সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ২৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা; যা মোট বিনিয়োগের ৩৫ শতাংশ। শহর ও গ্রামাঞ্চলের সবুজায়ন, পানি সংরক্ষণ খাতে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ ধরা হয়েছে, যা মোট বিনিয়োগের ২১ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রধান নগরগুলোতে (পানি সরবরাহ, পয়ঃনিস্কাশন, বন্যা নিযন্ত্রণ ও নিষ্কাশন) খাতে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৯ হাজার কোটি টাকা, ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা; যা মোট বিনিয়োগের ২৫ শতাংশ।

এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ২০২১ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ধরা হয়েছে, যা মোট বিনিয়োগের তিন শতাংশ। কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনায় ২০২১ সাল পর্যন্ত চার হাজার কোটি টাকা, ২০৩১ সাল পর্যন্ত ২৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ ধরা হয়েছে; যা মোট বিনিয়োগের চার শতাংশ। আর পরিবেশ ও প্রতিবেশ খাতে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত ৩২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ ধরা হয়েছে, যা মোট বিনিয়োগের পাঁচ শতাংশ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।