ব্যাংক খাতে অস্থিরতা নেই: আবদুল মুহিত

 

তিনি সোমবার এক প্রাক বাজেট আলোচনায় বলেছেন, “আমাদের ব্যাংকিং খাত নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে।…ইয়েস, সমালোচনা আমি উড়িয়ে দেব না। একটা ব্যাংকে সমস্যা আছে। এক পরিচালকের কারণে এ সমস্যা হয়েছে। তবে যতটা বলা হচ্ছে, সেরকম প্রবলেম (সমস্যা) আমি দেখি না।”

গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংক খাতে অস্থিরতা সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে উন্নতি হলেও ব্যাংক খাত নিয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও মন্তব্য করেন।

ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খল অবস্থা সরকারের অনেক অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে বলে সম্প্রতি মন্তব্য আসে সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের কাছ থেকেও।

ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন দুর্নীতি ঠেকাতে তদারকি বাড়ানোর সুপারিশ করেন।

ঋণ কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়মে নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে ধুঁকছে সরকারি, বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ও বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় যায়।

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীর মালিকানাধীন ফারমার্স ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের জন্য ঝুঁকির সৃষ্টি করছে বলে সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়।

খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের জন্য সমস্যা স্বীকার করে মুহিত বলেন, “হ্যাঁ, এনপিএল (খেলাপি ঋণ) আমাদের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটা বিগ প্রবলেম। মোট বিতরণ করা ঋণের এখন ১১ শতাংশ খেলাপি। সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি।”

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সরকারি ব্যাংকগুলোর অনেক সমস্যা আছে এটা ঠিক…। তবে এটা মনে রাখতে হবে তবে তাদের সরকারের প্রয়োজনে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় বিনিয়োগ করতে হয়। বেসরকারি ব্যাংকগুলো যেটা করে না।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সবমিলিয়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমান হচ্ছে সোয়া লাখ কোটি টাকা। এরমধ্যে নিয়মিত খেলাপি ঋণ ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার খারাপ ঋণ অবলোপন করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকা চেম্বারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এই প্রাক বাজেট আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আবুল কাসেম খান তাদের প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন।

অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরেন। একইসঙ্গে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের আকার এবং অগ্রাধিকার খাতগুলোর বিষয়েও আলোকপাত করেন।

তিনি বলেন, আগামী বাজেটের আকার হবে ৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো। বরাবরের মতো এবারও শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সেনিটেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালনি এবং যোগাযোগ খাততে গুরুত্ব দেওয়া হবে। মোটা অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টিনি খাতে।

নতুন বাজেটে করের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না জানিয়ে মুহিত বলেন, “নতুন ধরনের কিছু থাকবে না। চলতি বাজেটের চেয়ে ১১ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হবে।”

ব্যবসায়ীদের সব মহল থেকে করপোরেট ট্যাক্স কমানোর ব্যাপারে যে দাবি উঠেছে, তা বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরেও লক্ষ্যের চেয়ে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। গত অর্থবছরে রেমিটেন্স কমলেও এবার তা ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। রপ্তানি আয়েও ৭/৮ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হবে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন বাড়ানোর ফলে দুর্নীতি কমেছে দাবি করে মুহিত বলেন, “আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন খুবই ভালো স্যালারি (বেতন) পান। শেখ হাসিনার সরকার সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এমনভাবে সংস্কার করেছেন যা আন্তর্জাতিক মানের।

“এর ফলে করাপশন (দুর্নীতি) কমেছে। যেটা আছে, সেটা সহসা (ইমিডিয়েট) যাবে না। আমর ধারণা, দুর্নীতি নিম্ন পর্যায়ে আসতে আরও ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে।”

ঢাকা চেম্বার নেতাদের ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর দাবির বিষয়ে মুহিত বলেন, “এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ব্যাংক মালিকদের নির্দেশনা দিয়েছেন।”

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত

অর্থমন্ত্রী সঞ্চয়পত্রের সুদের হার আরও কমানোর কথা আবারও বলেছেন।

তিনি বলেন, “আমাদের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশ বেশি। সাধারণত ব্যাংকের আমানতের সুদের হারের চেয়ে এর হার ১ শতাংশ বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের তার চেয়েও বেশি। আমরা এর আগেও একবার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু নানা বিষয় চিন্তা করে কমানো হয়নি।

“তবে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর বিষয়টি এখনও বিবেচনায় আছে। এটা রিভিও করা হবে।”

সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পেনশনার এবং পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এখন সাড়ে ১২ শতাংশের মতো। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বাড়ার পরও ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার এর চেয়ে অনেক কম।